বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় শহিদ দিবসের চেতনাকে ধারণ করে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা ও ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে আহ্বান।

আবু আফজাল সালেহ
কবি, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
বাংলা ভাষা আজ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। এটি আমাদের জাতির জন্য গৌরবের বিষয়। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের আত্মসমালোচনারও সময় এসেছে— আমরা কি সত্যিই বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে পেরেছি?
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল কেবল একটি ভাষাগত দাবি নয়; এটি ছিল আত্মপরিচয়, ন্যায়বিচার এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার সংগ্রাম। ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগ আমাদের শিখিয়েছে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার শিক্ষা। একুশ মানে প্রতিবাদ, সাহস, আত্মমর্যাদা এবং বিজয়ের অঙ্গীকার।
তবুও স্বাধীনতার বহু বছর পরেও বাংলা ভাষা তার নিজের রাষ্ট্রে পূর্ণাঙ্গ ‘কাজের ভাষা’ হয়ে উঠতে পারেনি। প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নানা ক্ষেত্রে এখনো বাংলার প্রয়োগ সীমিত। আদালতের নির্দেশনার মাধ্যমে রাষ্ট্রভাষা ব্যবহারের বাস্তবতা আমাদের জন্য গর্বের নয়, বরং আত্মসমালোচনার বিষয়।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশ্ব ভাষা বৈচিত্র্যের সম্মান রক্ষার এক মহৎ উদ্যোগ। কিন্তু বাংলা ভাষার নিজস্ব সংকট, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং রাষ্ট্রীয় প্রয়োগ নিশ্চিত করার জন্য জাতীয়ভাবে একটি সুস্পষ্ট কেন্দ্রবিন্দু প্রয়োজন। সেই প্রয়োজন থেকেই ‘বাংলা ভাষা দিবস’-এর ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
শহিদ দিবসের শোক ও শ্রদ্ধা অক্ষুণ্ণ রেখেই ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি। কারণ ভাষা শহিদদের প্রতি সবচেয়ে অর্থবহ শ্রদ্ধা কেবল ফুল দেওয়া নয়—বাংলা ভাষাকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শক্তিশালী করে তোলা।
বাংলা সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির জগতে ভাষার সৃজনশীল বিকাশ অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু বৃহত্তর পেশাগত ও জ্ঞানভিত্তিক বিশ্বে বাংলার কার্যকর উপস্থিতি এখনো সীমিত। বিজ্ঞান, চিকিৎসা, প্রযুক্তি ও গবেষণায় সমৃদ্ধ বাংলা পরিভাষা, মানসম্মত অভিধান এবং আধুনিক ভাষা-অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
বাংলা ভাষা দিবস হতে পারে সেই জাতীয় অঙ্গীকারের দিন—যেদিন আমরা প্রতি বছর ভাষার অবস্থা মূল্যায়ন করব, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নির্ধারণ করব এবং নতুন প্রজন্মকে বাংলার শক্তিতে বিশ্বাসী করে তুলব।
বাংলা ভাষা বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ বা আসামের ভৌগোলিক সীমায় আবদ্ধ থাকবে না—এটি ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে। বাংলা হয়ে উঠুক জ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রশাসন ও মানবিক চেতনার একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক ভাষা।
একুশের চেতনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়— ভাষা কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, ভবিষ্যতের নির্মাণশক্তি। আসুন, শহিদদের আত্মত্যাগকে শক্তিতে রূপান্তর করি এবং বাংলা ভাষাকে আত্মমর্যাদার সঙ্গে স্বয়ংসম্পূর্ণ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করার অঙ্গীকার গ্রহণ করি।
— সমাপ্ত —
লেখক পরিচিতি:
আবু আফজাল সালেহ একজন কবি, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক। শিক্ষা-সনদ অনুযায়ী তাঁর পূর্ণ নাম আবু আফজাল মোহা. সালেহ। ১৯৮১ সালের ১৫ অক্টোবর চুয়াডাঙ্গা জেলার মদনা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. রেজাউল করিম এবং মাতা শাহিদা বেগম।
গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে তিনি দর্শনা সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বাংলা দৈনিক, অনলাইন পোর্টাল ও সাহিত্যপত্রিকায় তিনি নিয়মিত কবিতা, প্রবন্ধ, সাহিত্যসমালোচনা ও ফিচার লিখে থাকেন। বাংলা সাহিত্যসমালোচনায় আমেরিকান ও ইউরোপীয় ইংরেজি সাহিত্যধারার সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়ে নতুন বিশ্লেষণধারা নির্মাণে তিনি সচেষ্ট।
প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ:
১. বারবার ফিরে আসি (কবিতা, ২০১৮)
২. ছড়ায় ছড়ায় উৎসব (ছড়া, ২০১৮)
৩. বলেই ফেলি ভালোবাসি (কবিতা, ২০২২)
৪. কাব্যশৈলীর কতিপয় দিগন্ত (প্রবন্ধ, ২০২৪)
৫. জল পাথরে বন পাহাড়ে (ভ্রমণধর্মী কবিতা, ২০২৪)
তিনি সাহিত্যভিত্তিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বাংলাবাঁক (www.banglabuk.com)–এর
সম্পাদক। সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি চাঁদপুর চর্যাপদ একাডেমি দোনাগাজি পদক-২০২১, প্রিয়বাংলা লেখক সম্মাননা-২০২৩, সাহিত্যরস সম্মাননা-২০১৮ এবং দৈনিক মানববার্তা সম্মাননা-২০১৮ লাভ করেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি দুই কন্যার জনক। স্ত্রী আনজুমান আরা পারু গৃহিণী।
ইমেইল: abuafzalsaleh@gmail.com
COMMENTS