ভাষা আন্দোলনের চেতনায় বাংলা ভাষা দিবস প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা, ভাষার গবেষণা, প্রযুক্তিগত বিকাশ ও বৈশ্বিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ড. মিল্টন বিশ্বাসের ভাবনা।

ড. মিল্টন বিশ্বাস
শিক্ষাবিদ, গবেষক ও লেখক
বাংলা ভাষা আমাদের জাতিসত্তা, ইতিহাস, আত্মমর্যাদা ও সাংস্কৃতিক চেতনার প্রাণভিত্তি। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অসংখ্য শহিদের আত্মত্যাগ কেবল একটি ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ছিল না; এটি ছিল মানুষের মৌলিক অধিকার, আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার এক মহিমান্বিত ঘোষণা। তাই ঐতিহাসিক শহিদ দিবসের চেতনাকে ধারণ করে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সময়োপযোগী, যৌক্তিক এবং গভীর তাৎপর্যপূর্ণ।
আজকের বিশ্বায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থা ও বহুভাষিক বাস্তবতায় বাংলা ভাষা যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে, তেমনি নানা সংকট ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখিও হচ্ছে। শিক্ষা, প্রশাসন, গবেষণা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আন্তর্জাতিক জ্ঞান-বিনিময়ের পরিসরে বাংলা ভাষার কার্যকর ব্যবহার ও পরিকল্পিত বিকাশ এখন সময়ের দাবি। রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত একটি বাংলা ভাষা দিবস বাংলা ভাষার মর্যাদা, ব্যবহারিক প্রসার, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও বৈশ্বিক উপস্থিতি বৃদ্ধির জন্য শক্তিশালী নৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মাণ করতে পারে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের বৈশ্বিক গুরুত্ব অক্ষুণ্ণ রেখেই জাতীয় পর্যায়ে বাংলা ভাষার সুরক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, অনুবাদ, প্রকাশনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভাষাবোধ জাগ্রত করার জন্য বাংলা ভাষা দিবস একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক উপলক্ষ হতে পারে। এর মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের শহিদদের স্মৃতি আরও জীবন্ত হবে এবং বাংলা ভাষার সমসাময়িক প্রয়োজন, সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে নতুন জাতীয় মনোযোগ সৃষ্টি হবে।
বাংলা ভাষা কেবল আবেগের আশ্রয় নয়; এটি বিশ্বজ্ঞান, সৃজনশীলতা, মানবিক মূল্যবোধ ও সভ্যতার এক শক্তিশালী বাহন। বাংলা ভাষা দিবসের এই মহৎ উদ্যোগ বাংলা ভাষাকে আগামী প্রজন্মের জন্য আরও সমৃদ্ধ, প্রযুক্তিবান্ধব ও বিশ্বমুখী করে তুলবে— এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।
“বাংলা ভাষা হোক জ্ঞান, সৃজন ও বিশ্বসংলাপের দীপ্ত মাধ্যম।”
— সমাপ্ত —
লেখক পরিচিতি:
ড. মিল্টন বিশ্বাস প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, গবেষক, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও সাহিত্যসমালোচক। তিনি বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। ১৯৭১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পাবনায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ২০০৭ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
বাংলা সাহিত্যে ‘সাব-অল্টার্ন’ (Subaltern) বা নিম্নবর্গ তত্ত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষক হিসেবে তিনি সুপরিচিত। তাঁর প্রকাশিত মৌলিক ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা পঁচিশের অধিক। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্পে নিম্নবর্গের মানুষ, সাব-অল্টার্ন তত্ত্ব: উদ্ভব ও বিকাশ, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে নিম্নবর্গের মানুষ প্রভৃতি।
গবেষণা ও অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকগুলোতে নিয়মিত কলাম ও সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ লিখে থাকেন। সাহিত্যের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও সমকালীন সমাজভাবনায় তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্বীকৃত। সৃজনশীল ও গবেষণামূলক কাজের জন্য তিনি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
ইমেইল: writermiltonbiswas@gmail.com
COMMENTS