মাতৃভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় রক্ষায় বাংলা ভাষা দিবস প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথাশিল্পী কাজী রাফির ভাবনা।

কাজী রাফি
কথাশিল্পী
মানবসভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন ভাষা। ভাষাই মানব-ইন্দ্রিয়ের গভীরতম উপলব্ধিকে ধারণ করে এবং সেই উপলব্ধির বহুমাত্রিক স্ফটিকখণ্ড মানবজীবনের প্রবাহে ছড়িয়ে দেয়। মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও ইন্দ্রিয়লব্ধ জগত থেকে আহৃত ভাবনা ও অনুভূতির সংযোগ স্থাপন করে মানুষে মানুষে। মাতৃভাষা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির অন্তরাল থেকে স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও চিন্তার জগৎকে স্পষ্টভাবে প্রকাশের শক্তি জোগায়।
ভাষার পরিব্যাপ্তি সংকুচিত হলে সমাজ ও রাষ্ট্রে ধার করা পরিভাষা ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ে। অন্য ভাষা শেখা ও তার চর্চা মেধার বিকাশে সহায়ক হলেও বাছবিচারহীনভাবে ধার করা ভাষা ও পরিভাষার ব্যবহার একটি জাতিকে ধীরে ধীরে তার নিজস্ব শিকড় থেকে বিচ্যুত করে। এভাবে জাতির সাংস্কৃতিক জাগরণের অনুভব ভোঁতা হয়ে গেলে মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসাও ক্রমে ম্লান হয়ে যায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়— যে জাতি নিজ ভাষাকে অবজ্ঞা করে, সে জাতির আত্মবিলুপ্তির পথও সেখান থেকেই শুরু হয়।
স্বভাষাভাষী মানুষের মধ্যে মাতৃভাষার চর্চা যত বিস্তৃত হয়, তাদের আত্মপরিচয় ও সত্তাবোধ তত সমৃদ্ধ হয়। ভাষা যখন লিখিত রূপ লাভ করে, তখন তার কার্যকারিতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ভাষার এই বহুমাত্রিক প্রয়োগের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ক্ষেত্র নিঃসন্দেহে সাহিত্য। সাহিত্য ভিন্ন সময়, ভিন্ন মানুষ এবং ভিন্ন জাতিসত্তার মধ্যে শাশ্বত মানবিক ও আত্মিক মূল্যবোধের সেতুবন্ধন রচনা করে।
একজন লেখকের সৃজনশীলতার প্রকৃত সূচনা ঘটে ভাষার মহৎ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে এবং সেইসব অনুচ্চারিত সম্ভাবনাকে অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে, যা এখনও ভাষায় সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়নি। মানুষের আবেগ, অনুভূতি ও নন্দনতাত্ত্বিক উৎকর্ষ সময়ের পরিবর্তন অতিক্রম করে নিজস্ব মহিমায় স্থায়ী হয়ে থাকে।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সময়োপযোগী, যৌক্তিক এবং গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। আমি এই মহৎ উদ্যোগকে আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানাই।
— সমাপ্ত —
লেখক পরিচিতি:
কথাশিল্পী কাজী রাফি ২২ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে বগুড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা কাজী রইচ উদ্দীন এবং মাতা ফিরোজা বেগম। তিনি ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ, বগুড়া থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে গ্রাজুয়েশনসহ কমিশনপ্রাপ্ত হন। পরবর্তীতে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন।
‘ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা’ তাঁর প্রথম উপন্যাস, যা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই পাঠক ও সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই উপন্যাসের জন্য তিনি এইচএসবিসি কালি ও কলম সাহিত্য পুরস্কার–২০১০ অর্জন করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা, ত্রিমোহিনী, রূপডাঙ্গার সন্ধানে, পাসওয়ার্ড, রংধনুর সাঁকো, লে জোঁ নদীর বাঁকে, নিঃসঙ্গতার নগ্ন খোলস, অরোরার আঙুল, ছায়ার নির্বাসন নির্বাসনের ছায়া, আঁধারে লুকানো সুর, গ্রামটির নাম গোধূলিমায়া, নোরার ক্যাসল অব ক্যাসাব্লাঙ্কা, আটলান্টিকের পড়ন্ত বিকেল প্রভৃতি।
জাতিসংঘে কর্মরত থাকার সুবাদে তিনি আফ্রিকার দুটি দেশে দুই বছরেরও বেশি সময় বসবাস করেছেন। আফ্রিকার প্রকৃতি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনযাপন তিনি কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। মানুষ, সংস্কৃতি ও প্রকৃতি অন্বেষণের আগ্রহে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে স্বভূমির মানুষ ও সংস্কৃতির পাশাপাশি আফ্রিকার প্রকৃতি, মানবজীবন এবং শোষণবাস্তবতার শিল্পিত উপস্থাপন বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
ইমেইল: kazirafi06@gmail.com
COMMENTS