
বাংলা ভাষা কেবল একটি যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি বাংলাদেশের জাতীয় সত্তা, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রগঠনের মৌলিক ভিত্তি। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে যে আত্মত্যাগ, চেতনা ও সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল, তা পরবর্তীকালে স্বাধীনতা আন্দোলন ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও বাংলা ভাষার সুরক্ষা, বিকাশ ও আধুনিকায়নে একটি সমন্বিত ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় রূপরেখা অনুপস্থিত।
এই প্রেক্ষাপটে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে জাতীয়ভাবে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি। এটি কোনো নতুন দিবস সৃষ্টির প্রচেষ্টা নয়; বরং ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে যথাযথ নামে ও কার্যকর কাঠামোর মাধ্যমে পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। শহীদ দিবসের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে; বাংলা ভাষা দিবস তার সমসাময়িক রাষ্ট্রীয় রূপ।
কেন ‘বাংলা ভাষা দিবস’ প্রয়োজন
১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
- ১৯৪৮–১৯৫১: পাকিস্তান আমলে ১১ মার্চ ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ হিসেবে পালিত হতো।
- ১৯৫২: ২১শে ফেব্রুয়ারির রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার দাবিতে চূড়ান্ত মোড় নেয়।
- ১৯৫৩–১৯৫৫: দিনটি ‘ভাষা আন্দোলন দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।
- পাকিস্তান সরকারের রাজনৈতিক বাধার কারণে দিনটি ‘শহীদ দিবস’ নামে সীমাবদ্ধ থাকে।
- ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পরও ২১শে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি।
ঐতিহাসিকভাবে ২১শে ফেব্রুয়ারি মূলত বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দিবস। তাই দিনটিকে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ নামে চিহ্নিত করা ইতিহাসসম্মত ও যৌক্তিক।
২. আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও বাংলা ভাষা
- ২১শে ফেব্রুয়ারি বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে ‘International Mother Language Day’ হিসেবে পালিত হয়, যার মূল দর্শন হলো বিশ্বব্যাপী ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষা।
- এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অর্জন হলেও,
- কোনো একক ভাষার সুরক্ষা ও বিকাশের জন্য নয়,
- বাংলা ভাষা এখানে একটি উদাহরণ মাত্র, কেন্দ্রীয় বিষয় নয়।
ফলে বাংলা ভাষার সমসাময়িক সংকট, নীতিগত প্রয়োজন ও আধুনিকায়নের প্রশ্ন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের কাঠামোর ভেতরে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।
৩. সমসাময়িক বাস্তবতা ও সংকট
ক) সুরক্ষা ও ব্যবহার
- সংবিধানের ৩ নং অনুচ্ছেদে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হলেও আদালত, উচ্চশিক্ষা ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ইংরেজির প্রাধান্য রয়ে গেছে।
- পেশাগত ও কর্পোরেট ক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহার সীমিত।
খ) বিকাশ ও সমৃদ্ধি
- সাহিত্য, গণমাধ্যম ও বিনোদনে ভাষার প্রমিত রূপ ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে।
- বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উচ্চশিক্ষায় পর্যাপ্ত বাংলা পরিভাষা ও মানসম্মত উপকরণের অভাব রয়েছে।
- ডিজিটাল ও প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মে বাংলা ভাষার পূর্ণাঙ্গ ও মানসম্মত সমর্থন এখনো নিশ্চিত হয়নি।
গ) নতুন চ্যালেঞ্জ
- ‘বাংলিশ’ সংস্কৃতির বিস্তার
- ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার অযাচিত প্রভাব
- প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োগে রাষ্ট্রভাষার সীমিত উপস্থিতি
এই বাস্তবতায় বাংলা ভাষা আজ সাংবিধানিকভাবে শক্তিশালী হলেও ব্যবহারিকভাবে দুর্বল।
প্রস্তাবিত অবস্থান ও কাঠামো
২১শে ফেব্রুয়ারির কাঠামো:
- জাতীয়ভাবে: বাংলা ভাষা দিবস (শহীদ দিবসের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে)
- আন্তর্জাতিকভাবে: International Mother Language Day
- যৌথ পরিচয়ে: বাংলা ভাষা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস
শহীদ দিবস বিলুপ্ত নয়; বরং বাংলা ভাষা দিবসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে আরও তাৎপর্যপূর্ণভাবে সংযুক্ত থাকবে।
বাংলা ভাষা দিবসের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
- বাংলা ভাষার সুরক্ষা, বিকাশ ও সমৃদ্ধির জন্য একটি রাষ্ট্রীয় ফোকাল পয়েন্ট তৈরি করা
- শিক্ষা, প্রশাসন, বিচার ও প্রযুক্তিতে বাংলার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা
- নতুন প্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে উদ্বুদ্ধ করা
- বাংলা ভাষাকে আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক পরিসরে প্রতিযোগিতামূলক করা
- জাতীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস সুদৃঢ় করা
বাস্তবায়ন রূপরেখা (সংক্ষেপ)
- রাষ্ট্রীয় গেজেট ও নীতিগত স্বীকৃতি
- জাতীয় পর্যায়ে বার্ষিক কর্মসূচি ও নির্দেশিকা
- শিক্ষা ও প্রযুক্তিখাতে বিশেষ উদ্যোগ
- গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সমন্বিত প্রচারণা
- আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রস্তুতিমূলক কূটনৈতিক উদ্যোগ
‘বাংলা ভাষা দিবস’ কোনো প্রতীকী দিবস নয়; এটি একটি প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক হস্তক্ষেপ।
ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে সমসাময়িক বাস্তবতায় কার্যকর করতে হলে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে জাতীয়ভাবে বাংলা ভাষার সুরক্ষা, বিকাশ ও সমৃদ্ধির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার বিকল্প নেই।
শহীদ দিবসের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে বাংলা ভাষা দিবস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, বাংলা ভাষা অতীতের গৌরবের সঙ্গে ভবিষ্যতের শক্তি হিসেবেও আমাদের সামনে উপস্থিত হবে।