বাংলা ভাষার মর্যাদা, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ বিকাশের প্রশ্নে নতুন দায়বদ্ধতা তৈরির প্রস্তাব হিসেবে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ প্রবর্তনের গুরুত্ব।

রঞ্জনা বিশ্বাস
লেখক
বাংলা ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এটি আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ এবং জাতীয় আত্মপরিচয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এই সত্যকেই ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অগণিত ভাষা শহিদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা যেমন রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা অর্জন করেছে তেমনি একটি জাতির আত্মমর্যাদা, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এবং মানবিক অধিকারের প্রতীক হিসেবে বিশ্বমানবতার ইতিহাসে স্থান লাভ করেছে। ভাষা আন্দোলনের এই ঐতিহাসিক চেতনা কেবল স্মৃতিচারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। এই চেতনা সমকালীন ভাষা-বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি সক্রিয় সাংস্কৃতিক ও নীতিগত অনুশীলনে রূপ নেওয়া প্রয়োজন। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও রাষ্ট্র পরিচালনা, শিক্ষা, বিচারব্যবস্থা, প্রযুক্তি ও জ্ঞানচর্চার বহু ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার পূর্ণাঙ্গ ও সুসংহত ব্যবহার এখনো নিশ্চিত হয়নি। ফলে ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক বিজয়ের পরেও বাংলা ভাষা নানামুখী চ্যালেঞ্জ ও অবক্ষয়ের ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
২১শে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালিত হওয়া নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক অর্জন। এর মাধ্যমে ভাষাগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ, মাতৃভাষার অধিকার এবং বহুভাষিক সহাবস্থানের গুরুত্ব বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে এই বৈশ্বিক উদ্যাপনের প্রেক্ষাপটে বাংলা ভাষার নিজস্ব ঐতিহাসিক সংগ্রাম, সমসাময়িক সংকট এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রশ্ন অনেক সময় জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না। এই প্রেক্ষাপটে ‘শহিদ দিবস’-এর ঐতিহাসিক মর্যাদা ও তাৎপর্য অক্ষুণ্ন রেখে দিনটিকে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ হিসেবে রূপায়িত করার প্রস্তাব একটি সময়োপযোগী ও চিন্তাশীল উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ শহিদ দিবসের আত্মত্যাগের চেতনাই আমাদেরকে ভাষার মর্যাদা, সুরক্ষা এবং বিকাশের প্রশ্নে নতুন করে দায়বদ্ধ করে। ‘বাংলা ভাষা দিবস’ সেই দায়বদ্ধতাকে আরও সুসংগঠিত ও কার্যকরভাবে জাতীয় নীতি, শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে যুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে উঠতে পারে।
শহিদ দিবস এবং বাংলা ভাষা দিবস একই ঐতিহাসিক ধারার পরিপূরক। ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগের স্মৃতি আমাদেরকে অতীতের গৌরব স্মরণ করায়, আর বাংলা ভাষা দিবস সেই আত্মত্যাগের চেতনাকে ভবিষ্যতের কর্মপরিকল্পনায় রূপান্তর করার আহ্বান জানায়। প্রয়োজনে দিনটি ‘বাংলা ভাষা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে যৌথভাবে পালন করা যেতে পারে, যাতে একদিকে বিশ্বব্যাপী ভাষাগত বৈচিত্র্যের প্রতি সংহতি প্রকাশ করা যায় এবং অন্যদিকে জাতীয়ভাবে বাংলা ভাষার সুরক্ষা, বিকাশ ও সমৃদ্ধির জন্য একটি সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা গড়ে তোলা সম্ভব হয়।
ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার আমাদের জন্য একটি চলমান দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবেই বাংলা ভাষার মর্যাদা, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার এবং আধুনিক জ্ঞানব্যবস্থায় এর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার হওয়া উচিত। বাংলা ভাষা দিবস প্রবর্তনের প্রস্তাব সেই অঙ্গীকারকে নতুনভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার এবং বাস্তবায়নের একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
###
লেখক পরিচিতি:
রঞ্জনা বিশ্বাস। জন্ম ১০ ডিসেম্বর ১৯৮১, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার খাগবাড়ি গ্রামে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএসএস। কবিতা ও লোকসংস্কৃতি তাঁর প্রধান আগ্রহের ক্ষেত্র। গবেষণাকর্মের জন্য তিনি ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার ২০১৫’, ‘ব্র্যাক ব্যাংক–সমকাল হুমায়ূন আহমেদ তরুণ সাহিত্যিক পুরস্কার ২০২০’ এবং ‘অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার ১৪২৮’ অর্জন করেছেন।
COMMENTS