রাষ্ট্রীয় নথিতে একটি ‘বা’ এবং ২১ ফেব্রুয়ারির দ্ব্যর্থতা

‘শহীদ দিবস বা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’— এই দ্ব্যর্থতার ভেতরে লুকিয়ে থাকা রাষ্ট্রীয় সংকেত ও বাংলা ভাষা দিবসের প্রয়োজনীয়তা।


রাষ্ট্রীয় নথি, পরিপত্র কিংবা জাতীয় দিবসের তালিকা—এসব জায়গায় ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দ কেবল ভাষাগত নয়, নীতিগতও। বিশেষ করে যখন সেই শব্দটি হয় ‘বা’।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন নথি ও প্রকাশনায় ২১ ফেব্রুয়ারি সম্পর্কে যে সংজ্ঞাটি ব্যবহার করা হচ্ছে— “শহীদ দিবস বা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: ২১ ফেব্রুয়ারি”— এই একটি লাইনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি গভীর রাষ্ট্রীয় প্রশ্ন: আমরা কি একটি ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় স্মৃতিকে ধীরে ধীরে দ্ব্যর্থতার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছি?

Prothom Alo
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনের বরাত দিয়ে প্রথম আলোয় প্রকাশিত সংবাদের স্ক্রিনশট

এই প্রবন্ধে আমরা সেই ‘বা’-কে কেন্দ্র করেই বিশ্লেষণ করব— ভাষাগতভাবে, নীতিগতভাবে এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে।


‘বা’ মানে কী: ভাষাগত নয়, নীতিগত বিশ্লেষণ

বাংলা ভাষায় ‘বা’ সাধারণত বিকল্প নির্দেশ করে। অর্থাৎ—এটি অথবা ওটি। রাষ্ট্রীয় নথিতে যখন দুটি পরিচয়কে ‘বা’ দিয়ে যুক্ত করা হয়, তখন সেটি সমন্বয় নয়; বরং অস্পষ্টতা তৈরি করে।

“শহীদ দিবস বা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” বলার অর্থ দাঁড়ায়—
  • এটি শহীদ দিবস হতে পারে,
  • অথবা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হতে পারে,
  • কিন্তু কোনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রাধান্যপ্রাপ্ত, তা স্পষ্ট নয়।
রাষ্ট্রীয় স্মৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে এই ধরনের বিকল্প ভাষা ব্যবহার নীতিগতভাবে দুর্বল অবস্থান নির্দেশ করে।


শহীদ দিবস: একটি রাষ্ট্রীয় ভিত্তি, কোনো বিকল্প নয়

২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২—এই তারিখটি কেবল একটি আন্দোলনের দিন নয়। এটি ছিল:
  • রাষ্ট্রভাষার দাবিতে প্রথম শহীদ আত্মদান,
  • গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য জনগণের রক্তদানের নজির,
  • পরবর্তীকালে স্বাধীনতা সংগ্রামের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি।
এই কারণে ‘শহীদ দিবস’ ছিল এবং থাকা উচিত একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রীয় দিবস, যার ভিত্তি শহীদদের আত্মত্যাগ এবং রাষ্ট্রের দায়।

কিন্তু যখন রাষ্ট্র নিজেই এই দিবসকে আরেকটি আন্তর্জাতিক দিবসের সঙ্গে ‘বা’ দিয়ে যুক্ত করে, তখন শহীদ দিবসের সেই স্বতন্ত্রতা ভাষাগতভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়


আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: সম্মানজনক, কিন্তু ভিন্ন প্রেক্ষাপট

১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃতিতে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য:
  • বিশ্বব্যাপী ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষা,
  • মাতৃভাষার অধিকার সংরক্ষণ,
  • বহুভাষিক সমাজে পারস্পরিক সম্মান।
এটি একটি আন্তর্জাতিক অবজারভেন্স ডে। এটি কোনো রাষ্ট্রের নিজস্ব ভাষানীতি, শহীদ স্মৃতি বা জাতীয় ইতিহাসকে প্রতিস্থাপন করার জন্য নয়।

অতএব, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এবং শহীদ দিবস—এই দুটি দিবসের উদ্দেশ্য, দর্শন ও দায় এক নয়।


‘বা’-এর অন্তর্নিহিত ঝুঁকি: নীরব ডি-ন্যাশনালাইজেশন

রাষ্ট্রীয় নথিতে ‘বা’ ব্যবহারের দীর্ঘমেয়াদি ফল হতে পারে:
  • শহীদ দিবসের রাষ্ট্রীয় স্মরণ ধীরে ধীরে প্রতীকী পর্যায়ে নেমে আসা,
  • প্রশাসনিক ও শিক্ষানীতিতে শহীদ দিবসের গুরুত্ব কমে যাওয়া,
  • ভবিষ্যতে কেবল “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস (২১ ফেব্রুয়ারি)” নামে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়া।
ইতিহাসে বহু রাষ্ট্রেই দেখা গেছে—দিবস কখনো একদিনে বাদ যায় না; আগে শব্দ বদলায়, তারপর স্মৃতি।


এই দ্ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে ‘বাংলা ভাষা দিবস’-এর প্রয়োজনীয়তা

এই প্রেক্ষাপটেই ‘বাংলা ভাষা দিবস’ একটি সমাধানমূলক রাষ্ট্রীয় ধারণা হিসেবে উঠে আসে।

‘বাংলা ভাষা দিবস’ প্রস্তাব করে—
  • শহীদ দিবসের স্মৃতি ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকবে,
  • শহীদদের আত্মত্যাগের চেতনার ভিত্তিতে বাংলা ভাষার সুরক্ষা, বিকাশ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবহার নিশ্চিত হবে,
  • আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস তার নিজস্ব আন্তর্জাতিক পরিসরে যথাযথভাবে পালিত হবে।
অর্থাৎ ‘বা’ নয়— স্পষ্ট দায়িত্ববণ্টন ও নামকরণ।


রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি: আবেগ নয়, নীতিগত দায়িত্ব

‘বাংলা ভাষা দিবস’ কোনো আবেগী দাবি নয়। এটি একটি নীতিগত প্রয়োজন:
  • রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার ব্যবহার, মান ও আধুনিকীকরণ নিশ্চিত করার জন্য,
  • শহীদ দিবসের আত্মত্যাগকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচর্চার সঙ্গে যুক্ত করার জন্য,
  • রাষ্ট্রীয় বিভ্রান্তি দূর করে একটি সুস্পষ্ট ভাষানীতি প্রতিষ্ঠার জন্য।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না থাকলেও ‘বাংলা ভাষা দিবস’ পালিত হবে—এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এই উদ্যোগকে প্রাতিষ্ঠানিক, টেকসই ও সর্বজনীন করে তুলবে।


‘বা’ থেকে বেরিয়ে আসার সময়

২১ ফেব্রুয়ারি কোনো বিকল্পের দিন নয়। এটি সিদ্ধান্তের দিন।

রাষ্ট্র যদি নিজের ইতিহাসকে ‘বা’ দিয়ে ঝুলিয়ে রাখে, তাহলে সেই ইতিহাস দুর্বল হয়। আর ইতিহাস দুর্বল হলে রাষ্ট্রও দুর্বল হয়।

‘বাংলা ভাষা দিবস’ সেই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার একটি প্রস্তাব—যেখানে শহীদদের স্মৃতি, ভাষার অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এক বিন্দুতে মিলিত হয়।

এখন প্রশ্ন একটাই: আমরা কি দ্ব্যর্থতার ‘বা’-তে থাকব, নাকি স্পষ্ট রাষ্ট্রীয় দায়ের পথে এগোব?

সূত্র:

আরও পড়ুন:





COMMENTS

পুনঃমুদ্রণ ও পুনঃপ্রকাশ প্রসঙ্গে:

এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কোনো বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ বা আংশিক, এমনকি একটি মাত্র বাক্য বা ভাবার্থ অন্য কোনো মাধ্যমে পুনঃমুদ্রণ বা পুনঃপ্রকাশ করতে হলে অবশ্যই মূল সূত্রের যথাযথ উল্লেখ করতে হবে। মুদ্রণ মাধ্যমে প্রকাশের ক্ষেত্রে সূত্রের নাম এবং অনলাইন মাধ্যমে প্রকাশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট লেখার সরাসরি লিংক সংযুক্ত করা আবশ্যক।


নতুন প্রবন্ধের জন্য:

কোন গণমাধ্যমে প্রকাশের জন্য বাংলা ভাষা দিবস ও বাংলা ভাষা বিষয়ক নতুন ও মৌলিক প্রবন্ধ চেয়েও আমাদের কাছে অনুরোধ জানাতে পারেন।

A Part of Bangla Language Council | Literature Omnibus

Made with in NYC by Julius Choudhury
Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Read More Reply Cancel reply Delete By হোম PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE খোঁজ ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy Table of Content