শহিদ দিবসের চেতনাকে ধারণ করে বাংলা ভাষা দিবস প্রতিষ্ঠার আহ্বান— শোক থেকে শক্তিতে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে ভাষার সুরক্ষা ও বিকাশের প্রতিশ্রুতি।

সুশান্ত হালদার
কবি
ভাষা মানুষের আত্মপরিচয়ের প্রথম ও প্রধান ভিত্তি। জন্মের পর মায়ের মুখে শেখা শব্দমালাই আমাদের ভাব, অনুভূতি ও চেতনার প্রথম প্রকাশমাধ্যম। সেই অর্থে বাংলা ভাষা কেবল যোগাযোগের উপকরণ নয়— এটি আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার ধারক।
বাংলা ভাষার বিকাশ বহু সহস্রাব্দের বিবর্তনের ফল। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী থেকে উৎপত্তি হয়ে সংস্কৃত, প্রাকৃত, পালি ও মাগধীর ধারা পেরিয়ে বাংলা আজ একটি স্বতন্ত্র ও সমৃদ্ধ ভাষা হিসেবে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত। চর্যাপদের মতো প্রাচীন নিদর্শন থেকে আধুনিক সাহিত্য— সবখানেই এর গভীরতা ও ব্যাপ্তি সুস্পষ্ট।
কিন্তু এই ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য আমাদের জাতিকে একসময় রক্ত দিতে হয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সালাম, বরকত, রফিকসহ অসংখ্য শহিদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি অর্জন করে। এই আত্মদান কেবল একটি ভাষার জন্য নয়— এটি ছিল অধিকার, মর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম।
আজ, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পরও বাংলা ভাষা নিজ দেশে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, উচ্চশিক্ষা ও প্রযুক্তিতে এর পূর্ণ প্রয়োগ এখনো নিশ্চিত হয়নি। একইসঙ্গে ‘বাংলিশ’ সংস্কৃতি ও ভিনভাষার অযাচিত প্রভাব নতুন প্রজন্মকে শুদ্ধ ভাষা চর্চা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ‘শহিদ দিবস’-এর চেতনাকে অক্ষুণ্ণ রেখে দিনটিকে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি। এটি কোনো নাম পরিবর্তন নয়— বরং শোকের গণ্ডি পেরিয়ে ভাষার সুরক্ষা, উন্নয়ন ও বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করার একটি জাতীয় অঙ্গীকার। শহিদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে তখনই, যখন বাংলা রাষ্ট্রের সর্বস্তরে কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
আসুন, একুশকে শুধু স্মরণের নয়—সংকল্পের দিনে পরিণত করি। শহিদের রক্তে রঞ্জিত এই দিনেই আমরা প্রতিজ্ঞা করি— বাংলা ভাষাকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করব।
— সমাপ্ত —
লেখক পরিচিতি:
সুশান্ত হালদার (জন্ম: ১০ জানুয়ারি ১৯৭৪) সমসাময়িক বাংলাদেশি কবি ও সাহিত্যিক। মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার সুতালড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে আন্ধারমানিক, বয়ড়া এলাকায় বসবাস করছেন। পেশায় তিনি হরিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ইপিআই) হিসেবে কর্মরত।
তিনি মূলত প্রেম, জীবনদর্শন, সমাজবাস্তবতা ও মানবিক অনুভূতির বহুমাত্রিক প্রকাশ নিয়ে কবিতা রচনা করেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ২০-এর বেশি; উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে নীলা, অবন্তীকার কাছে খোলা চিঠি, অনির্বাণ, একটি যুদ্ধ ও প্রেম, লাশকাটা ঘর, নীল মাধুরীর আত্মহত্যা এবং আগুন ডানার পাখি।
তাঁর বহু কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পেয়েছে; বিশেষভাবে নীলার জন্য নীল খাম ও অবন্তীকার কাছে খোলা চিঠি শিরোনামের আবৃত্তি অ্যালবাম শ্রোতাদের কাছে সমাদৃত।
ইমেইল: sushantah4@gmail.com
COMMENTS