ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক চেতনা পুনরুদ্ধারে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন কবি ও গবেষক চাষা হাবিব।

চাষা হাবিব
কবি ও গবেষক
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন নিছক ভাষার প্রশ্ন ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীভূত বৈষম্য ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক সুস্পষ্ট রাজনৈতিক প্রতিবাদ। মহান ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতিসত্তা, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। ভাষা শহিদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
এই আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে— ভাষা কেবল প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি অস্তিত্ব, অধিকারবোধ ও ন্যায়ের প্রশ্ন। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অগণিত শহিদের আত্মদান রক্তে লিখে দিয়েছে এই সত্য যে কোনো জাতির ভাষাকে উপেক্ষা করে তার ওপর টেকসই রাষ্ট্রকাঠামো দাঁড় করানো যায় না। ভাষা আন্দোলন তাই শুধু সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল ঔপনিবেশিক মানসিকতা, সাংস্কৃতিক আধিপত্য ও রাজনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক প্রতিরোধ, যা একটি জাতির আত্মমর্যাদার ভিত্তি নির্মাণ করেছে।
তবে গভীর আত্মসমালোচনার জায়গা এখানেই— যে ২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের ভাষার জন্য আত্মত্যাগের প্রতীক, সেটি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হলেও জাতীয় পরিসরে বাংলা ভাষার নিজস্ব সংকট, অবমূল্যায়ন ও নীতিগত দুর্বলতাগুলো অনেকাংশে আড়ালে থেকে যাচ্ছে। বৈশ্বিক ভাষা বৈচিত্র্যের উদযাপনের ভেতরে বাংলা ভাষা আন্দোলনের তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সুর— রাষ্ট্রীয় অবহেলা ও সাংস্কৃতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ— ক্রমশ ম্লান হয়ে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘শহিদ দিবস’-এর চেতনাকে ধারণ করে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ প্রবর্তনের প্রস্তাব সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ বলে আমি মনে করি।
এই বাস্তবতায় ‘শহিদ দিবস’-এর অন্তর্নিহিত চেতনাকে পুনরুদ্ধার করা জরুরি। ‘বাংলা ভাষা দিবস’ কেবল একটি নাম পরিবর্তনের বিষয় নয়; বরং ইতিহাসকে তার যথার্থ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে পুনঃস্থাপনের একটি প্রয়াস। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়— ভাষার প্রশ্ন আজও জীবন্ত ও প্রাসঙ্গিক। প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি ও জ্ঞানচর্চায় বাংলা ভাষার সীমিত ব্যবহার আমাদের স্বাধীনতার মৌলিক চেতনার সঙ্গেই বৈপরীত্য তৈরি করে।
বাংলা ভাষার বিকাশ মানে কেবল সাহিত্যচর্চা নয়; এটি জ্ঞান উৎপাদন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এবং বৈশ্বিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে সত্যিকার অর্থে ধারণ করতে হলে প্রয়োজন সাহসী ভাষানীতি, বাস্তবভিত্তিক প্রয়োগ এবং সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদার পুনর্গঠন।
আমি বিশ্বাস করি, ‘বাংলা ভাষা দিবস’ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলে এটি শুধু স্মরণের দিন নয়, কর্মসূচির দিন হয়ে উঠবে— যে দিন আমরা ভাষানীতির সীমাবদ্ধতা পর্যালোচনা করব, নতুন দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শক্তিশালী ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রচর্চার অঙ্গীকার গ্রহণ করব।
ভাষা আন্দোলনের শহিদদের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা জানাতে হলে তাঁদের আত্মত্যাগের রাজনৈতিক ও মানবিক তাৎপর্য স্পষ্টভাবে স্বীকার করতে হবে। ‘বাংলা ভাষা দিবস’ সেই স্বীকৃতিরই একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে বিস্তৃত জাতীয় পর্যালোচনা এখনই শুরু হওয়া প্রয়োজন।
বাংলা ভাষা বেঁচে থাকুক তার পূর্ণ মর্যাদায়, স্বাধীন চেতনায় ও সাহসী উচ্চারণে।
— সমাপ্ত —
লেখক পরিচিতি:
চাষা হাবিব (পৈত্রিক নাম: মো. হাবিবুর রহমান) একজন কবি, গবেষক ও সাহিত্যসংগঠক। জন্ম ২২ নভেম্বর ১৯৮০, দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার কাজিহাল ইউনিয়নের দাদুল গ্রামে। পেশাগতভাবে কলেজ শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত।
তিনি মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা গবেষণা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যয়ন, সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে আসছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সেমিনার ও গবেষণা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছেন। লেখালেখির পাশাপাশি সম্পাদনা, পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও প্রকাশনা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।
চাষা হাবিব দিনাজপুর যাদুঘর ও হেমায়েত আলী লাইব্রেরির প্রাক্তন নির্বাহী সদস্য। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। তিনি দৈনিক উত্তরবাংলা পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক এবং তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও মননভিত্তিক চতুর্মাসিক সাহিত্যপত্রিকা ‘বাহে’ সমকালীন সাহিত্যচর্চায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।
কবিতা ও গবেষণায় অবদানের জন্য তিনি দেশব্যাপী বিভিন্ন সম্মাননা লাভ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে বিশ্বভরা প্রাণ কবি সম্মাননা (২০১৯), বায়ান্ন কবি সম্মাননা (২০১৯), শব্দশর সাহিত্য সম্মাননা (২০২০), দিনাজপুর লেখক পরিষদ সম্মাননা (২০২১), কবিতার মাটি সাহিত্য পুরস্কার (২০২২), মোহন কুমার দাস স্মৃতি পদক (২০২২) এবং বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদ বিশেষ সম্মাননা (২০২৫)।
তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ১২টি; প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে আরও ২২টি গ্রন্থ। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকা, সাময়িকী ও গবেষণা জার্নালে তাঁর ৬০টির বেশি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
ইমেইল: chasahabib@gmail.com
COMMENTS