ভাষা শহিদদের চেতনাকে ধারণ করে বাংলা ভাষার সুরক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োগ নিশ্চিত করতে বাংলা ভাষা দিবস প্রতিষ্ঠার আহ্বান।

ড. বি এম শহীদুল ইসলাম
শিক্ষাবিদ, গবেষক ও কলাম লেখক
বাংলা ভাষা বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক সত্তা ও ঐতিহাসিক অস্তিত্বের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির চিন্তা, মূল্যবোধ, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের শক্তিশালী অবলম্বন।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন ছিল শুধু ভাষার স্বীকৃতির দাবি নয়— এটি ছিল জাতিসত্তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জন এবং আত্মপরিচয় রক্ষার এক ঐতিহাসিক সংগ্রাম। ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে একটি জাতি তার ভাষার মধ্য দিয়েই সম্মান, অধিকার ও স্বাধীনতার ভিত্তি নির্মাণ করে।
এই প্রেক্ষাপটে ঐতিহাসিক ‘শহিদ দিবস’-এর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে দিনটিকে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সময়োপযোগী, যৌক্তিক এবং ভবিষ্যতমুখী একটি জাতীয় পদক্ষেপ। ভাষা শহিদদের স্মরণ শুধু শোকের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকলে তাদের আত্মত্যাগের পূর্ণ তাৎপর্য বাস্তবায়িত হয় না; বরং সেই চেতনাকে ভাষার বিকাশ, জ্ঞানচর্চা ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োগে রূপান্তর করাই হবে প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি।
ভাষা মানুষের সৃজনশীলতা, জ্ঞানচর্চা, সামাজিক যোগাযোগ ও জাতীয় অগ্রগতির প্রধান মাধ্যম। তাই বাংলা ভাষাকে শিক্ষা, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, গবেষণা, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির কার্যকর ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা আজ জাতীয় প্রয়োজন। বিশেষভাবে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বাংলা ভাষার পরিসর সম্প্রসারণ অপরিহার্য। দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ নিশ্চিত করা জাতির সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা ও বৌদ্ধিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভাষা আন্দোলনের চেতনা আমাদের ইতিহাসের বিভিন্ন গণআন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধকে প্রেরণা জুগিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় আজও ভাষার মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়, জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন ও নৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চলমান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ভাষার মান সংরক্ষণ, ভাষানীতি বাস্তবায়ন এবং অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির অনেক প্রত্যাশাই এখনো পূর্ণ বাস্তবায়ন পায়নি।
অতএব বাংলা ভাষার সুরক্ষা, বিকাশ ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ভাষাতত্ত্ববিদ, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সাংবাদিক, পেশাজীবী, উদ্যোক্তা ও সচেতন নাগরিকসহ সকলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। রাষ্ট্রীয় নীতি, শিক্ষা কাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞানব্যবস্থায় বাংলা ভাষার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাই আগামী প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়িত্ব।
আমি প্রত্যাশা করি, ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগ আমাদের জাতিকে নতুন উদ্দীপনায় ঐক্যবদ্ধ করবে এবং বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত ও জ্ঞানসমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের পথ সুদৃঢ় হবে।
বাংলা ভাষা দিবস প্রতিষ্ঠার এই উদ্যোগ জাতির আত্মপরিচয় পুনর্নির্মাণের এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হয়ে উঠুক— এই কামনা করি।
— সমাপ্ত —
লেখক পরিচিতি:
ড. বি এম শহীদুল ইসলাম বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক ও প্রজ্ঞাবান কলাম লেখক। সমাজ সংস্কার, রাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষণ এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে তাঁর গবেষণা ও লেখালেখি বুদ্ধিজীবী মহলে বিশেষভাবে সমাদৃত।
তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মারটিনবিল ইউনিভার্সিটি (Martinville University) থেকে সম্মানজনক ফেলোশিপ অর্জন করেছেন। তাঁর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র সমাজ কাঠামো, রাষ্ট্রীয় নীতি ও জনকল্যাণভিত্তিক সংস্কার।
জাতীয় দৈনিকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁর বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধ নিয়মিত প্রকাশিত হয়। সামাজিক অসংগতি, নৈতিক সংকট, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান বিষয়ে তিনি যুক্তিনির্ভর ও বাস্তবসম্মত মতামত তুলে ধরেন।
রাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক ও সমাজচিন্তক হিসেবে তিনি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নৈতিক নেতৃত্ব বিকাশে সক্রিয়ভাবে কাজ করে চলেছেন। তাত্ত্বিক গবেষণার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
তিনি বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য— শ্রেষ্ঠ লেখক সম্মাননা (ভিন্নমাত্রা প্রকাশনী), শিক্ষা সম্প্রসারণ সম্মাননা এবং শিল্প মন্ত্রণালয় প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ প্রশিক্ষণার্থী সম্মাননা।
ইমেইল: drshahidulislam30@gmail.com
COMMENTS