বাংলা ভাষার ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও জাতীয় পরিচয়ের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ হিসেবে পালনের আহ্বান।

মো. আকতার হোসাইন
ব্যাংকার ও কলামিস্ট
বাংলা আমাদের মাতৃভাষা— আমাদের অস্তিত্ব, অনুভূতি, আত্মত্যাগের ইতিহাস ও সংস্কৃতির গভীরতম ভিত্তি। বিশ্ব ইতিহাসে এর দ্বিতীয়টি নেই। ভাষাটি এতটাই মধুর, প্রাঞ্জল ও হৃদয়স্পর্শী যে এটি মানুষের মনে শিহরণ জাগায়। এ কারণেই ইউরোপীয়রা যখন সমগ্র বিশ্ব শাসন করেছিল, তখন অধিকাংশ উপনিবেশে নিজেদের ভাষা চাপিয়ে দিলেও বাংলা ভাষাভাষীদের ক্ষেত্রে ঘটেছিল ব্যতিক্রম। বরং তারাই এ ভাষা আয়ত্ত করে উপমহাদেশের শাসনব্যবস্থায় নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল।
অপরদিকে পাকিস্তানিরা এই ভাষাটিকেই বিলুপ্ত করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত বাংলার মাটি থেকেই বিতাড়িত হয়েছে। ১৯৪৮ সালে যখন ঘোষণা করা হয়— উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, তখন থেকেই ছাত্র-জনতার প্রতিবাদ শুরু হয়। তবে এর চূড়ান্ত পরিণতি আসে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে। তাই এ দিনটি একই সঙ্গে শহিদ দিবস ও রাষ্ট্রভাষা দিবস হিসেবে অধিকতর তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে ঝরেছে অসংখ্য প্রাণ।
পাকিস্তান সরকার রাজনৈতিক কারণবশত কিংবা নিজেদের সীমাবদ্ধতার কারণে ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে গিয়ে দিনটিকে ‘শহিদ দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যা আজও প্রচলিত রয়েছে। যদিও দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সমগ্র বিশ্বে স্বীকৃত, তবুও দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধারণ ও প্রসারের স্বার্থে ‘শহিদ দিবস’-এর পাশাপাশি ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ নামটিও অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে অনেকেই মনে করেন। এই একটি নামের মধ্যেই আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পূর্ণতা নিহিত রয়েছে।
সুতরাং বিষয়টি রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং যথাযথ মর্যাদা পাওয়ার দাবি রাখে। দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত হলেও ‘বাংলা’ শব্দটি অনেকাংশে আড়ালেই থেকে যায়। অতএব, এটি ‘বাংলা ভাষা দিবস’ হিসেবে জাতীয়ভাবে পালনের দাবি রাখে।
দিনটিকে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করা হলে এর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ভাষাগত বৈশিষ্ট্য পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিফলিত হবে। তাই সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি আহ্বান—বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেওয়া হোক।
— সমাপ্ত —
লেখক পরিচিতি:
মো. আকতার হোসাইন একজন ব্যাংকার, লেখক ও কলামিস্ট। পেশাগতভাবে ব্যাংকিং খাতে যুক্ত থাকলেও কর্মজীবনের শুরু একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও)-এর মাধ্যমে। ছাত্রজীবন থেকেই সাংবাদিকতা, গল্প ও কবিতা লেখার প্রতি তাঁর আগ্রহ গড়ে ওঠে। দীর্ঘ বিরতির পর তিনি পুনরায় লেখালেখিতে সক্রিয় হন এবং বর্তমানে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে উপ-সম্পাদকীয় নিবন্ধের মাধ্যমে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে নিয়মিত লিখছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রংপুরের কারমাইকেল কলেজ থেকে ব্যবস্থাপনা বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ২০ মে ১৯৮৭ সালে কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী উপজেলার একটি সীমান্তবর্তী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
ইমেইল: aktarrofikul@gmail.com
COMMENTS