ভাষা আন্দোলনের চেতনায় মাতৃভাষায় শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চা বিস্তারের আহ্বান জানিয়েছেন অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. হুমায়ুন কবির।

ড. এ.কে.এম. হুমায়ুন কবির
শিক্ষক, গবেষক ও লেখক
মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গের গৌরব আমাদেরই— ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতিসত্তার ভিত্তিকে চিরভাস্বর করেছে। ভাষাশহিদদের আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়— ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার মূল ভিত্তি।
বিশ্বে প্রায় ৭,০০০ ভাষা প্রচলিত থাকলেও প্রতি দুই সপ্তাহে একটি ভাষা বিলুপ্ত হচ্ছে, এবং প্রায় ৪০% মানুষ মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এই প্রেক্ষাপটে বাংলা ভাষা, যা প্রায় ৩০ কোটিরও বেশি মানুষের ভাষা, জ্ঞানচর্চার প্রধান মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার যথেষ্ট যোগ্যতা রাখে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের উচ্চশিক্ষায় বাংলার ব্যবহার এখনো সীমিত। অধিকাংশ শিক্ষার্থী বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করে এসে উচ্চশিক্ষায় হঠাৎ ইংরেজিনির্ভর হয়ে পড়ে, ফলে তারা বিষয়ের গভীরতা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, “শিক্ষায় মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধস্বরূপ”— এটি কেবল সাহিত্যিক উক্তি নয়, আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানের স্বীকৃত সত্য। মাতৃভাষায় শিক্ষা শিক্ষার্থীর বোধগম্যতা, সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, যেখানে বিদেশি ভাষাভিত্তিক শিক্ষা প্রায়ই মুখস্থনির্ভরতা সৃষ্টি করে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো— চীন, জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স— নিজেদের মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করে জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রগতি অর্জন করেছে। আমাদেরও উচিত বাংলা ভাষায় মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, আন্তর্জাতিক গবেষণার অনুবাদ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, বাংলা একাডেমিকে শক্তিশালী করা এবং প্রযুক্তিতে বাংলার বিস্তৃতি নিশ্চিত করা।
‘বাংলা ভাষা দিবস’ এই চেতনাকে বাস্তবায়নের একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। এটি আমাদের অতীতের আত্মত্যাগকে ভবিষ্যতের জ্ঞানভিত্তিক অঙ্গীকারে রূপান্তরিত করতে পারে। আসুন, আমরা মাতৃভাষায় জ্ঞানচর্চাকে শক্তিশালী করি এবং বিশ্বমঞ্চে আত্মবিশ্বাসের সাথে উচ্চারণ করি—
মোদের গরব, মোদের আশা—
আ মরি বাংলা ভাষা।
— সমাপ্ত —
লেখক পরিচিতি:
অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. হুমায়ুন কবির চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও লেখক। শিক্ষা ও গবেষণায় তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে এবং তাঁর রচিত গ্রন্থ বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকগুলোতে নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন। শিক্ষা ও গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক সম্মাননা অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ইমেইল: akmhumayun@cvasu.ac.bd
COMMENTS