শহীদ দিবসের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে কেন ও কীভাবে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ প্রবর্তন জরুরি— এই লেখায় জানুন তার ঐতিহাসিক, নীতিগত ও সুসংহত বিশ্লেষণ।

বাংলা ভাষা বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও রাষ্ট্রীয় সত্তার মৌলিক ভিত্তি। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে আত্মত্যাগ ও চেতনার জন্ম হয়েছিল, তা কেবল ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নয়; এটি ছিল শাসনব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক দমন ও মানবিক মর্যাদার বিরুদ্ধে একটি যুগান্তকারী গণপ্রতিরোধ। একুশে ফেব্রুয়ারি সেই আত্মত্যাগের প্রতীক—যা জাতীয়ভাবে ‘শহীদ দিবস’ এবং আন্তর্জাতিকভাবে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃত।
তবে স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও বাংলা ভাষার সুরক্ষা, পরিকল্পিত বিকাশ ও আধুনিক রাষ্ট্রীয় ব্যবহারের জন্য একটি স্বতন্ত্র, কার্যকর ও জাতীয়ভাবে নিবেদিত দিবস প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। এই প্রেক্ষাপটে শহীদ দিবসের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে একুশে ফেব্রুয়ারিকে জাতীয়ভাবে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ হিসেবে প্রবর্তনের প্রস্তাব কোনো নতুন দিবস সৃষ্টির উদ্যোগ নয়; বরং ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক চেতনাকে সমসাময়িক রাষ্ট্রীয় বাস্তবতায় কার্যকর করার একটি যৌক্তিক, দায়িত্বশীল ও নীতিগতভাবে অপরিহার্য প্রয়াস।
ঐতিহাসিক ভিত্তি
একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষাগত পরিচয় ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পাকিস্তান গণপরিষদে সরকারি কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহারের প্রস্তাব বাতিল হওয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৪৯ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত ১১ মার্চ ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ একাধিক তরুণের আত্মদান বাংলা ভাষার দাবিকে ইতিহাসের অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। এই ঘটনার পর থেকেই একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের প্রধান দিবস হিসেবে জাতীয়ভাবে স্বীকৃত হয় এবং পরবর্তী সময়ে ‘ভাষা আন্দোলন দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।
বাস্তবিক অর্থে, একুশে ফেব্রুয়ারির মূল তাৎপর্য ছিল বাংলা ভাষার অধিকার, মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠা। ঐতিহাসিক ও নৈতিকভাবে এই দিনটি ‘বাংলা ভাষা দিবস’ নামে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়ার পূর্ণ যৌক্তিকতা বহন করলেও তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার পর দিনটি ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা এবং পরে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে বৈশ্বিক স্বীকৃতি লাভ করলেও, বাংলা ভাষার স্বতন্ত্র রাষ্ট্রীয় দিবস হিসেবে এর আনুষ্ঠানিক রূপ আজও অনুপস্থিত।
নীতিগত অপরিহার্যতা
স্মরণ থেকে কার্যকর উত্তরাধিকার বর্তমান বাস্তবতায় বাংলা ভাষা একাধিক কাঠামোগত ও ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি—
- প্রশাসন, উচ্চশিক্ষা ও বিচার ব্যবস্থায় ইংরেজি-নির্ভরতা
- শিক্ষাব্যবস্থায় ভাষাগত বিভাজন ও বৈষম্য
- গণমাধ্যম ও বিজ্ঞাপনে ভাষার বিকৃতি ও অবক্ষয়
- বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল পরিসরে মানসম্মত বাংলার ঘাটতি
- প্রমিত ভাষা ও পরিভাষা চর্চার দুর্বলতা
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশ্বব্যাপী ভাষাগত বৈচিত্র্য ও মাতৃভাষার অধিকারকে গুরুত্ব দিলেও, বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও বাংলা ভাষার সমসাময়িক নীতিগত সংকট সেখানে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রতিফলিত হয় না। ফলে জাতীয় পর্যায়ে একটি নিবেদিত দিবসের অভাবে ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের ব্যবহারিক ও নীতিগত উত্তরাধিকার অনেকাংশে প্রতীকী স্মরণেই সীমাবদ্ধ থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় উপলক্ষ হতে পারে—যার মাধ্যমে ভাষানীতি পর্যালোচনা, দায়বদ্ধতা নির্ধারণ এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ জাতীয়ভাবে সম্ভব হবে।
শহীদ দিবস ও বাংলা ভাষা দিবস: বিরোধ নয়, ধারাবাহিকতা
শহীদ দিবসের মূল চেতনা হলো আত্মত্যাগের স্মরণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন। অন্যদিকে বাংলা ভাষা দিবসের লক্ষ্য হলো সেই আত্মত্যাগের ফলস্বরূপ প্রাপ্ত ভাষার সুরক্ষা, বিকাশ ও আধুনিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা। ফলে এই দুটি ধারণা পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একই ঐতিহাসিক ধারার দুইটি পরিপূরক ও ক্রমান্বিত রূপ।
শহীদ দিবস আমাদের স্মরণ করায় কেন প্রাণ দিতে হয়েছিল, আর বাংলা ভাষা দিবস আমাদের প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—আমরা সেই প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত ভাষাটিকে কতটা মর্যাদা, ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ দিতে পেরেছি। এই ধারাবাহিক উপলব্ধি জাতীয় চেতনাকে আরও গভীর, দায়বদ্ধ ও কর্মমুখী করে তুলতে পারে।
প্রস্তাবিত বাস্তবায়ন রূপরেখা (সংক্ষিপ্ত)
- একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘শহীদ দিবস ও বাংলা ভাষা দিবস (আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস)’ হিসেবে যৌথ পরিচয়ে প্রবর্তন।
- ‘বাংলা ভাষা দিবস’-কে রাষ্ট্রীয় ‘ক’ তালিকাভুক্ত জাতীয় দিবস হিসেবে অন্তর্ভুক্তকরণ।
- প্রতিবছর এই দিনে—
- বাংলা ভাষা ব্যবহারের রাষ্ট্রীয় পর্যালোচনা প্রতিবেদন প্রকাশ
- শিক্ষা, প্রশাসন ও গণমাধ্যমে ভাষা ব্যবহারের নীতিগত নির্দেশনা জারি
- গবেষণা, অনুবাদ, পরিভাষা উন্নয়ন ও প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা বিস্তারের কর্মসূচি গ্রহণ
- সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন।
একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক দিন। এই দিনের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখেই ‘বাংলা ভাষা দিবস’ প্রবর্তন কোনো বিভাজন বা বিকল্প প্রস্তাব নয়; বরং এটি ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি একটি দায়িত্বশীল, প্রাতিষ্ঠানিক ও ভবিষ্যতমুখী রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া।
বাংলা ভাষার সুরক্ষা, বিকাশ ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় এই উদ্যোগ একটি সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে—যা কেবল স্মরণ নয়, বরং পরিকল্পিত কর্মের মাধ্যমে একুশের চেতনাকে সমসাময়িক রাষ্ট্রগঠনের অংশ করে তুলবে।
COMMENTS