ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগ, ভাষার মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ বিকাশকে সামনে রেখে বাংলা ভাষা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন শফিক সাইফুল।

শফিক সাইফুল
সাহিতিক, সম্পাদক ও প্রকাশক
বাংলা ভাষা আমাদের জাতিসত্তা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন কেবল একটি ভাষাগত দাবি ছিল না; এটি ছিল বাঙালির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সংগ্রাম। ২১শে ফেব্রুয়ারি সেই সংগ্রামের চূড়ান্ত প্রতীক— যেদিন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অগণিত তরুণ মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় আত্মোৎসর্গ করেছিলেন। এই আত্মত্যাগ বাঙালির ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
বাংলা ভাষা আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভাষা; প্রায় ২৪ কোটিরও বেশি মানুষ এই ভাষায় কথা বলে। তবু বাস্তবতার একটি দিক হলো— রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনের বহু ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার, উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। শিক্ষা, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, গবেষণা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তিতে বাংলার পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
২১শে ফেব্রুয়ারি আজ বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়, যা ভাষাগত বৈচিত্র্য ও মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। একই সঙ্গে এই দিনটি বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনের ঐতিহাসিক স্মারক। তাই শহিদদের আত্মত্যাগের চেতনাকে ধারণ করে দিনটিকে জাতীয়ভাবে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ হিসেবে আরও সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করা একটি যৌক্তিক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ বলে আমি মনে করি।
‘বাংলা ভাষা দিবস’ প্রতিষ্ঠা কেবল একটি প্রতীকী ঘোষণা হবে না; এটি বাংলা ভাষার পরিকল্পিত বিকাশ, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে বিস্তার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে ভাষা-সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য একটি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের প্রতীক হতে পারে। একই সঙ্গে এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়— ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির চিন্তা, সৃজনশীলতা ও মানবিকতার ধারক।
আমি বিশ্বাস করি, শহিদ দিবসের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে জাতীয়ভাবে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলে ভাষা আন্দোলনের চেতনা আরও অর্থবহভাবে বর্তমান ও ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত হবে। এর মাধ্যমে বাংলা ভাষার সুরক্ষা, বিকাশ ও বৈশ্বিক সম্ভাবনা নতুনভাবে শক্তিশালী হবে।
বাংলা ভাষা আমাদের আত্মার ভাষা— এই ভাষার মর্যাদা রক্ষা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা আমাদের সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব।
— সমাপ্ত —
লেখক পরিচিতি:
শফিক সাইফুল (পৈত্রিক নাম: মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম) একজন সাহিত্যিক, সম্পাদক, সাংবাদিক ও প্রকাশক। ১ জুন ১৯৮২ সালে নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার এনায়েতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে লেখালেখির মাধ্যমে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন এবং পরবর্তীতে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিনির্ভর লেখালেখিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
তিনি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘সাহিত্যদেশ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও কর্ণধার। অমর একুশে বইমেলাসহ বিভিন্ন সময়ে নবীন ও প্রবীণ লেখকদের গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে সমকালীন বাংলা সাহিত্যচর্চার প্রসারে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত সংকলন ‘বাংলাদেশের কবি ও কবিতা’ গ্রন্থে বিভিন্ন প্রজন্মের কবিদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়াস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
প্রকাশনা কার্যক্রমের পাশাপাশি তিনি সাহিত্যপত্রিকা ‘সাহিত্যদেশ’ সম্পাদনা করছেন এবং লেখক-সাংবাদিক হিসেবে নিয়মিত সাহিত্য ও গণমাধ্যমচর্চায় যুক্ত আছেন। তাঁর রচিত গ্রন্থ ‘ফিরে দেখা ফেনী: আমার সাংবাদিকতা’ পাঠকমহলে সমাদৃত। সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও প্রকাশনা— এই তিন ধারার সমন্বয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিকাশে অবদান রাখাই তাঁর কাজের মূল অনুপ্রেরণা।
ইমেইল: sahityodesh@gmail.com
COMMENTS