মাতৃভাষার আবেগ, শিকড় ও আত্মপরিচয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে বাংলা ভাষাকে সম্মান করার আহ্বান জানিয়েছেন লেখক মোহনা আক্তার ইভা।

মোহনা আক্তার ইভা
সাহিত্যিক, গীতিকার, চিত্রনাট্যকার
মাতৃভাষা এমন এক ভাষা, যার প্রতিটি শব্দ সারাদিনের ক্লান্তি ও কর্মব্যস্ততার শেষে হৃদয়ে পরম স্নেহের শান্তি এনে দেয়। কেনই বা দেবে না? এই ভাষাতেই তো শৈশবে মা আকাশের উজ্জ্বল চাঁদ দেখিয়ে বলতেন, রাতের বেলা ভাতের থালা হাতে নিয়ে ডাক দিতেন,
“আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা, চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা।”
কখনো ঝড়ো বৃষ্টির রাতে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে চোখ বুজলেই ভেসে ওঠে সেই শৈশবের স্মৃতি। চারদিকে নিস্তব্ধতা, বাইরে বাতাস আর ঝিরঝির বৃষ্টি। দাদী-নানির কোলে মাথা রেখে শোনা হতো অচিন দেশের রাজকন্যা-রাজপুত্রের গল্প, রূপকথা কিংবা শিহরণ জাগানো ভূতের কাহিনি। রাক্ষস-খোক্কস বা দানবের গল্পে ভয় পেলে তারা হাসিমুখে বলতেন,
“ভূত আমার পূত, পেত্নী আমার ঝি, রাম-লক্ষ্মণ সাথে আছে, করবে আমার কী।”
এই ছিল আমাদের রঙিন শৈশব, বাংলা মায়ের স্মৃতিতে জড়ানো এক অনন্য সময়। এই স্মৃতি কখনো ভোলা যায় না।
কিন্তু আজ প্রশ্ন জাগে, আমি যাদের এসব কথা বলছি তারা কি সত্যিই শুনছে? নাকি শোনার প্রয়োজনই অনুভব করছে না? হয়তো ভুলটা আমারই। যাদের জন্য বলছি, তাদের কানে এখন বড় বড় হেডফোন। সারাদিন সেখানে বিদেশি ভাষার শব্দ। আমি বিদেশি ভাষার বিরোধী নই। আমিও ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষা বুঝি, পড়ি, লিখি।
কিন্তু তাই বলে কি বলা যায়, “বাংলা ঠিক আসে না”? আজকের অনেক তরুণ-তরুণী শিক্ষাজীবন শেষে এসে নিজের ভাষাকেই অবহেলা করে। এটি কি গ্রহণযোগ্য?
আমরা বাংলার মানুষ। আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে। একসময় বিদেশিরা এই বাংলার প্রকৃতি, ভাষা ও সংস্কৃতিতে মুগ্ধ হয়ে এখানে এসেছিল। এই মাটির প্রাচুর্য ও মানবিক শক্তিই তাদের আকৃষ্ট করেছিল।
আমি কাউকে বিদেশি ভাষা শেখা থেকে বিরত করতে চাই না। বরং বলতে চাই, নিজের মাতৃভাষাকে সম্মান করতে শিখুন। যে মানুষ নিজের ভাষায় চিন্তা ও প্রকাশে দক্ষ নয়, সে অন্য ভাষায়ও প্রকৃত পাণ্ডিত্য অর্জন করতে পারে না।
আজ আমরা মোবাইলের পর্দায় বাংলা ভাষার কথাই ইংরেজি অক্ষরে লিখি। বলি, বাংলায় লিখতে সময় লাগে। অথচ এতে দুই ভাষারই অসম্মান হয়। যদি বাংলায় লিখি, পূর্ণ বাংলায় লিখি। আর ইংরেজি লিখলে সম্পূর্ণ ইংরেজিতেই লিখি। তবেই ভাষা সম্মান পায়।
আসুন, আমরা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের পাশাপাশি একটি দিন নির্ধারণ করি, যা হবে শুধু আমাদের বাংলা ভাষার জন্য। সেই দিনটির নাম হোক বাংলা ভাষা দিবস। অন্তত একটি দিন আমরা সচেতনভাবে নিজের ভাষাকে অগ্রাধিকার দিই।
একটি কঠিন কিন্তু সত্য কথা হলো, বিপদের মুহূর্তে মানুষের মুখে প্রথম যে ভাষা আসে, সেটি তার মাতৃভাষা। তখন কেউ বলে না “please help me”, বরং বলে, “আমাকে বাঁচাও।” কারণ আমাদের শিকড় বাংলা ভাষায় প্রোথিত।
তাই বাংলা ভাষাকে আপন করে রাখুন। এর সম্মান রক্ষা করা আমাদের মৌলিক দায়িত্ব।
— সমাপ্ত —
লেখক পরিচিতি:
মোহনা আক্তার ইভা সমসাময়িক বাংলা নাট্য ও সৃজনশীল সাহিত্যের এক প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ লেখক, গীতিকার ও চিত্রনাট্যকার। কবিতা, নাটক, গান ও গল্প রচনার মাধ্যমে তিনি নিজস্ব সৃজনশীল পরিচয় গড়ে তুলেছেন।
২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর নোয়াখালীর লক্ষ্মীপুর জেলায় তার জন্ম। জন্মের পর তার চোখের নীলাভ বর্ণ পরিবার ও আশপাশের মানুষের কৌতূহলের কারণ হয়ে ওঠে। শৈশবেই বাবার কর্মসূত্রে তিনি নীলফামারীতে চলে আসেন এবং সীমিত সামাজিক পরিসরের মধ্যেই বেড়ে ওঠেন। শারীরিক কিছু দৃষ্টিজনিত সীমাবদ্ধতা ধীরে ধীরে তার জীবনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থিত হলেও তা তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি।
চিকিৎসা ও ব্যক্তিগত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের ভেতরে এক দৃঢ় মানসিক শক্তি গড়ে তোলেন। সাহিত্য ও সৃজনশীলতাই হয়ে ওঠে তার আত্মপ্রকাশের প্রধান মাধ্যম। চলচ্চিত্র নির্মাতা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি কবিতা, গান, নাটক ও গল্প লেখা শুরু করেন। কলকাতার চলচ্চিত্র নির্মাতা হিমাংশু খাঁর কাছ থেকে সংলাপ রচনার প্রাথমিক দিকনির্দেশনা তার সৃষ্টিশীল যাত্রাকে নতুন গতি দেয়।
তার লেখায় মানবিক অনুভূতি, সামাজিক বাস্তবতা, শিক্ষা-চেতনা এবং শিশুদের নির্মল শৈশব বারবার প্রতিফলিত হয়। অভিনয়শিল্পী হিসেবেও তিনি জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি অর্জন করেন এবং ২০২৩ ও ২০২৪ সালে বাংলাদেশে শিশু শিল্পী হিসেবে জাতীয় সম্মাননা লাভ করেন। তার রচিত কাজ আন্তর্জাতিক নারী চলচ্চিত্র উৎসবেও সমাদৃত হয়েছে।
দৃষ্টিগত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শ্রবণ ও স্মৃতিশক্তির অসাধারণ দক্ষতার কারণে শিক্ষকদের কাছে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। জীবনের বাধাকে শক্তিতে রূপান্তর করার বিশ্বাস নিয়ে তিনি সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে এগিয়ে চলেছেন। তার কাছে জীবনদর্শন একটাই, ইচ্ছা থাকলে পথ তৈরি হয়।
ইমেইল: mohonaeva90@gmail.com
COMMENTS